কৃতজ্ঞঃ কেন মুখ খুললাম | DailyNatunDiganto.Com
মূলপাতা / অপরাধ / কৃতজ্ঞঃ কেন মুখ খুললাম

নতুন দিগন্ত ডেস্ক

Site Administrator

কৃতজ্ঞঃ কেন মুখ খুললাম

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৫:৫৯

বাংলাভিশনের হেড অব নিউজ মোস্তফা ফিরোজের ফেজবুক থেকে হুবহু: বাংলাভিশনের কর্মীদের ছাঁটাই প্রসঙ্গে আমার নিজের পরিণতিও তুলে ধরার পর দেশ ও বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ আমার প্রতি তাদের গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে আমার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয় স্বজন ছাড়াও অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী ও শুভানুধ্যায়ী আছেন। মানুষের এতো বিপুল ভালোবাসায় আমি সত্যিই আপ্লুত হয়েছি। আমাকে সবাই যে এতোটা ভালোবাসেন আগে সেটা বুঝতে পারিনি। অনেকে ফেসবুক ওয়ালে, ম্যাসেনন্জার ইনবক্সে, ফোনের ম্যাসেজে ও টেলিফোনে তাদের সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন।
কেউ কেউ আমার আর্থিক সংকটের কথা বিবেচনা করে বিকাশ নাম্বার ও ব্যাংক একাউন্ট নাম্বারও চেয়েছেন। এগুলো স্নেহ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
আমি সত্যি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ও ঋনী।

কেন পোষ্ট দিচ্ছি?
এবছর ৪ এপ্রিল আমার বাধ্যতামূলক দুই মাসের ছুটি শেষ হবার পর বুঝলাম তারা আর আমাকে কাজে জয়েন করতে দিতে চান না। তার আগেই তারা এমন কিছু পরিবেশ তৈরি করেছে, যা আমার জন্য অসম্মানজনক। কেননা, গত দশ বছর নিউজে আমি যাকে বিশ্বাস করেছি, তার গোপন ভূমিকা যখন ধরতে পারলাম তখন বাংলাভিশনে আমার কাজ করার আগ্রহ চলে গেছে। বুঝলাম মালিকরা কেউ কেউ বিভাজন সৃষ্টিতে ইন্ধন দিচ্ছেন। আমি সবার ভালোবাসা নিয়ে চলতে চেয়েছি। কিন্তু আমার চেয়ারের প্রতি তার লোভের চোখ পড়লো। সৃষ্টি হলো পদ পাওয়ার লালসা। মালিকরা অফিসে আসলে গোপনে তাদের কাছে কাগজ নিয়ে ছোটাছুটি দেখতে পেলাম। আর আমি আমার কক্ষে চুপ করে বসে থাকতাম। ছাঁটাই তালিকা তৈরিতে তিনি সহযোগিতা করে তাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। একই সাথে আমার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করে চলেছেন। বার্তা বিভাগে সমান্তরাল একটা অবস্থান তৈরি করা হলো। বুঝলাম এটা আত্মঘাতী পথ। এই বয়সে টিকে থাকার জন্য গ্রুপিং করা আমার সাজে না। টেলিভিশনে আমার যোগ্যতা কি আমি সেটা জানি। এটা প্রশাসনিক কোন জব না। অবশ্যই ক্রিয়েটিভ কাজ। বুঝলাম আমার উদারতা সরলতা দিয়ে সবাইকে জয় করতে পারি নাই। যদিও এখন সবাই আমার জন্য মনে মনে যন্ত্রণাবিদ্ধ হচ্ছেন। থাক্,এই কথা।
যাহোক, যখন আমাকে কৌশলে প্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো তখন আমি নীরবে কেবল দেনা-পাওনার অপেক্ষায় ছিলাম। সেটাও না পেয়ে চুপই ছিলাম। চেয়ারম্যান, এমডি ও ডিএমডির শুভবুদ্ধির অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু পেরিয়ে গেলো আরো ৬ মাস। যদি তারা আমাকে বলতেন, আমাদের মাফ করে দেন। মাফ করে দিতাম। কিন্তু সব সংযোগ তারা বিচ্ছিন্ন করে দিলো।

তাহলে কেন মুখ খুললাম?
বাংলাভিশনে আমার সাথে যা করা হয়েছে সেটা আমি বলতে চাইনি। কষ্ট পাবে বলে আমার পরিবার পরিজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে লুকিয়েছি। বলেছি, করোনার কারণে অফিস আমাকে ছুটিতে থাকতে বলেছে। কিন্তু বাস্তবে এই সময়টা আমার জন্য ছিলো খুবই যন্ত্রণাকর। এই খারাপ সময়ে বাংলাভিশনে কাজ করতে পারছি না, সহকর্মীরা একের পর এক করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে, তাদেরকে অফিসও সহায়তা করছে না এসব পরিস্থিতি আমাকে খুবই পীড়িত করেছে তখন। বেকার অবস্থায়ও গোপনে কয়েকজনকে আর্থিক সহায়তা করেছি। অথচ বাসায় আমি বাজার খরচের টাকা দিতে পারছিলাম না। এমনকি অফিসে আমার সহকারী ইকবাল, যাকেও হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে ছাঁটাই করা হয়েছিলো, তার কাছ থেকে টাকা ধার করেছি। বাসায় আমার অসুস্থ কন্যা। কাউকে আমার প্রকৃত অবস্থা জানতে দেইনি। এমন খারাপ খবর জানতে দেইনি আমার অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীদের। তারা বলেছে, আমাকে বাংলাভিশনে দেখা যায়না কেন? উত্তরটা মিথ্যা দিয়েছি। বলেছি নিজের টিভিতে আর অনুষ্ঠান করবো না।
এতো সব করেছি, বাংলাভিশনের সুনামের কথা চিন্তা করে। আমি জানি, বাংলাভিশনে আমি নেই এটা প্রচারিত হলে এর দর্শক প্রিয়তা কমতে পারে। বিজ্ঞাপনদাতারা মুখ ঘুরিয়ে ফেলতে পারে। আমি ১২ বছর এই প্রতিষ্ঠানে রক্ত শ্রম দিয়েছি, ঘাম ঝরিয়েছি। কিন্তু আমি ছুটিতে থাকা অবস্থায় তারা আমার নামটি মুছে ফেলেছে। অথচ এখনো আমার দেয়া নামে কয়েকটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে। তাই চাইনি আমি বাংলাভিশনে নেই একথা প্রচার হয়ে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হোক। কিন্তু সবই অরণ্যে রোদন। মালিকরা মনে করলো, এখন প্রতিষ্ঠান লাভজনক। মোস্তফা ফিরোজ থাকলেই কি, না থাকলেই কি! যেন তাদের ইমেজেই প্রতিষ্ঠান চলে! মাঝে মাঝে আসেন। মুনাফা নিয়ে চলে যান। এই প্রতিষ্ঠানটি যাদের শ্রমে গড়ে উঠেছে তাদের সাথে কথাও বলেন না ঠিকমতো। তাদের নিয়ে বসাতো দূরের কথা সালামও ঠিকমতো নেন না।

তাহলে কেন কেন মুখ খুললাম?
এই হলো আমার প্রিয় খোকা ভাইয়ের স্বপ্নের বাংলাভিশনের বাস্তব অবস্থা। খোকা ভাই জীবিত থাকতে অনেক নতুন নতুন টিভি থেকে মোটা বেতনের অফার পেয়েছি। চাকরিজীবী হিসাবে আমার কাছে তা ছিলো খুবই আকর্ষনীয় অফার। কিন্তু কিভাবে খোকা ভাইকে বলবো যে আমি আর থাকবো না এখানে? তার বাসা পর্যন্ত গেছি। একথা সেকথা বলে আসল কথা বলার সুযোগ নিতে চেয়েছি। কিন্তু আমি হেরে গেছি। বলতে পারিনি উনাকে। খোকা ভাইকে কোন সমস্যার কথা বললেই বলতেন, এটাতো তোমার চ্যানেল। তুমি সব সমাধান করো। ভালোবাসার এমন কথা শুনে আবেগে আপ্লুত হতাম। চলে আসতাম। বুকের ছাতিটা বড়ো হয়ে যেতো। খোকা ভাইয়ের এসব কথা তার ছেলে ইশরাকও বলতেন। তিনি বলতেন, আব্বা সব সময় বলতো দিপু বাংলাভিশন পরিবারের সদস্য।
কিন্তু খোকা ভাই মারা যাবার পর থেকেই মনে হলো সামনে অশনি সংকেত। এখন আমার বিদায় নেয়াই উচিৎ। কেননা, এখন আর এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নীতিতে পরিচালিত নাও হতে পারে। আর মিডিয়া কর্মীদের সাথে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মতো আচরণ করা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। কিন্তু সেটা আমার বুঝতে দেরি হয়ে গেছে। ইশরাককে দেখে তার ভিতরে খোকা ভাইকে খুঁজতে গিয়ে বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আমার পা ডুবে গিয়েছিলো।

এখন আসল কথা শুনুন
আমি ভেবেছিলাম,এপ্রিল মাসে আমাকে বিদায় করতে যে চতুরতা করা হয়েছে সেটাই হবে শেষ ঘটনা। এজন্য আমি দেনা পাওনা না পেলেও চুপ থেকেছি। বিষয়টি জনসমক্ষে আর আনি নাই। কিন্তু মাত্র তিন দিন আগে একযোগে ১৫ জনের চাকরিচ্যুতির পর সিদ্ধান্ত নিলাম, নাহ আর চুপ থাকবো না। বুঝলাম, তাদের রক্ত ক্ষুধা শেষ হয়নি। করোনাকালে সরকার বাঁধা দিতে পারে বলে তারা চুপ ছিলো। কিন্তু এখন কিছুটা পরিবর্তিত পরিস্থিতির তারা সুযোগ নিয়েছে। এটা অত্যন্ত অমানবিক ও অন্যায্য। বাংলাভিশন এতোদিন যে লাভ করলো সেই টাকা কোথায় গেলো? যদি সংকট হয়েই থাকে তাহলে সেই টাকা মিডিয়া কর্মীদের রক্ষায় কেন কাজে লাগানো হলো না? নাকি সব টাকা শেষ? যার যার ব্যাংকে চলে গেছে?
অথচ বাংলাভিশন পরিচালনা করেন এর নিয়মিত কর্মীরা। মালিকদের এটা মূল ব্যবসা না। তাদের আসা যাওয়া অনিয়মিত। সেখানে দিনরাত পড়ে থেকে পরিশ্রম করেন কর্মীরা, যারা চরমভাব উপেক্ষিত ও অবহেলিত। সুতরাং, এই অবস্থায় আমার মতে বাংলাভিশন এখন সেখানকার কর্মীদেরই প্রতিষ্ঠান। যেহেতু মূল মালিক খোকা ভাইয়ের পরিবার প্রকাশ্যে এর মালিকানা দাবি করছেন না, তাই কর্মীদের মালিকানা দিয়ে একটি ট্রাষ্ট করা হোক।
আপনারা কোটি কোটি টাকার মালিক। একটা প্রতিষ্ঠান মিডিয়া কর্মীদের জন্য উৎসর্গ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। কি এমন ক্ষতি হবে আপনাদের?
এটা আমার একটা নির্দোষ প্রস্তাব।
আর যদি কর্মীদের মালিকানা দিতে ইচ্ছে না করে তাহলে সবার রুটি রুজির দায়িত্ব নিন। বয়সের বিবেচনায় এটাকে আপনার নিজের পরিবারের মতোই বিবেচনা করুন। আর্থিক স্বচ্ছতা প্রকাশ করুন। যা আয় হবে আপনাদের পকেট থেকে কিছু দিতে হবে না। বাংলাভিশনের আয় ও মুনাফা সবার ভিতরে ভাগ করে দিন। কেউ খাবে, আর কেউ অভুক্ত থাকবে এই নীতিহীনতা থেকে বের হয়ে আসুন।

দাবি পূরণ করুন,ফিরবো না, নো টেনশন..
আর আপনারা নিশ্চিত থাকুন বাংলাভিশনে আমি ফিরবো না। টেনশন করবেন না। কর্মীদের রুটি রুজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
আমার কথায় কেউ কষ্ট পাবেন না। অনেক আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে এসব কথা বলছি। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে আমি ১২ টা বছর আপনাদের সাথে কাটালাম। কিন্তু আপন হতে পারলাম না। বাকি জীবন দূরে কোথাও কাটাবো। তবুও বাংলাভিশনের কারো পেটে আর লাথি মারবেন না। প্লিজ, অনুরোধটি রাখুন।

For Advertisement

01672575878

দৈনিক নতুন দিগন্ত প্রকাশিত-প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত:

error: Content is protected !!