মো.শিফাত মাহমুদ ফাহিম,বিশেষ প্রতিনিধি: একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগেও কুসংস্কারের বলি হলেন জয় কুমার দেবনাথ (২১) নামে এক যুবক। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার তিলাবদূরী গ্রামে তান্ত্রিক চিকিৎসার নামে প্রকাশ্যে বিষধর গোখরো সাপ দিয়ে দংশন করিয়ে ওই যুবককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি এলাকায় শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
অসুস্থতা থেকে তান্ত্রিকের জালে নিহত জয় কুমার দেবনাথ উপজেলার তিলাবদূরী গ্রামের শ্রী নিমাই চন্দ্র দেবনাথের ছেলে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জয় দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে তান্ত্রিক ও কবিরাজদের প্রলোভনে পড়ে তার পরিবার অলৌকিক শক্তির ওপর ভরসা করেন। তান্ত্রিকদের পরামর্শে গত ১ জানুয়ারি থেকে তিলাবদূরী সর্বজনীন মন্দির প্রাঙ্গণে দুই দিনব্যাপী ‘বেহুলা-লখিন্দর’ গানের আসর ও বিশেষ তান্ত্রিক চিকিৎসার আয়োজন করা হয়।
চিকিৎসার নামে বিষপ্রয়োগ: প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ২টার দিকে চিকিৎসার এক বীভৎস পর্যায় শুরু হয়। উপস্থিত শত শত মানুষের সামনে তান্ত্রিক কবিরাজ দাবি করেন, সাপের বিষের মাধ্যমেই জয়কে সুস্থ করা সম্ভব। জনসম্মুখে জ্যান্ত গোখরো সাপ দিয়ে জয়ের শরীরের বিভিন্ন স্থানে কয়েকবার দংশন করানো হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই জয়ের শরীর নীল হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হলে তান্ত্রিকরা গা-ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করে।
খবর পেয়ে আত্রাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জয়ের মরদেহ উদ্ধার করে। আত্রাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল করিম জানান, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। চিকিৎসার নামে সাপের কামড় খাওয়ানো একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা খায়রুল আলম কড়া হুঁশিয়ারির সাথে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “তান্ত্রিক বা ওঝাদের এসব কর্মকাণ্ডের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এটি স্রেফ প্রতারণা এবং মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। সাপে কাটলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে আনলে জীবন রক্ষা সম্ভব। তান্ত্রিক অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে এখনই সামাজিকভাবে সোচ্চার হতে হবে।”
সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ: কুসংস্কারের বিষ ও আমাদের দায়বদ্ধতা উপজেলার তিলাবদূরী গ্রামে যা ঘটেছে, তাকে কেবল একটি মৃত্যু হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। বেহুলা-লখিন্দরের পৌরাণিক গাথাকে পুঁজি করে একদল ভণ্ড তান্ত্রিক মানুষের সরল বিশ্বাসকে ব্যবহার করে জীবন কেড়ে নিচ্ছে।
জনসাধারণের প্রতি আহ্বান:
১. যেকোনো অসুস্থতায় ওঝা বা তান্ত্রিকের কাছে না গিয়ে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।২. সাপে কাটলে বা বিষক্রিয়া হলে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করুন। সেখানে পর্যাপ্ত ‘অ্যান্টি-ভেনম’ মজুত রয়েছে।৩. আপনার এলাকায় এ ধরনের অপচিকিৎসা বা গানের নামে প্রতারণা চললে দ্রুত প্রশাসনকে অবহিত করুন।
কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে সমাজকে মুক্ত করতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রতিরোধ এখন সময়ের দাবি। জয় দেবনাথের মৃত্যু যেন আমাদের শেষবারের মতো সতর্ক করে দিয়ে যায়।
Leave a Reply