বিশেষ প্রতিনিধি:একসময় অন্যের বাজার করা, রান্নাবান্না ও বাসা দেখাশোনার কাজ করতেন। পরে কাস্টমসে মাস্টার রোলে পিয়নের চাকরি। আর এখন তাঁর নামে-বেনামে বিপুল জমি, কোটি টাকা ব্যয়ে ডুপ্লেক্স বাড়ি, রাজধানীর উত্তরায় একাধিক ফ্ল্যাট ও নির্মাণাধীন ভবন—আত্রাইয়ের আব্দুল জলিল সরদারের এমন উত্থান এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
স্থানীয়দের সরল প্রশ্ন—একজন সাধারণ কর্মচারীর পরিচয় থেকে কয়েক দশকের মধ্যে কীভাবে গড়ে উঠল এত বড় সম্পদের সাম্রাজ্য?
অনুসন্ধানে তাঁর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৯৫ বিঘা জমির তথ্যের দাবি পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে ঢাকার সম্পদ যুক্ত হলে মোট সম্পদের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা ও বৈধতার বিষয়টি সরকারি নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালে প্রভাবশালী মো. আজিমুদ্দিন সোনারের হাত ধরে ঢাকায় যান আব্দুল জলিল। শুরুতে তাঁর বাজার করা, রান্না এবং বাসা দেখাশোনার কাজ করতেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
পরে আজিমুদ্দিনের সহযোগিতায় কাস্টমসে মাস্টার রোলে পিয়নের চাকরি পান তিনি। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কাস্টমসের একজন পিয়নের চাকরি থেকে যে আর্থিক যাত্রা শুরু, সেটি কীভাবে এত অল্প সময়ের মধ্যে জমি-ফ্ল্যাট-বাড়ির বিশাল সম্পদে রূপ নিল?
কাস্টমসে চাকরির সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই ঘটনার পর তাঁর আর্থিক অবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে।
অভিযোগ আরও গুরুতর। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তবে ফাইল চুরির অভিযোগের বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন, বিভাগীয় নথি কিংবা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল জলিলের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে এলাকায় তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে। আত্রাইয়ের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন হেলালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
প্রশ্ন উঠছে—রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব কি সম্পদ অর্জন ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সুবিধা এনে দিয়েছিল?
এর উত্তর মিলতে পারে তাঁর সম্পদের দলিল, আয়কর বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন এবং চাকরির সময়কার আয়-ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণ করলে।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল জলিল সরদারের নামে হিঙ্গুলকান্দী, দমদত্ত বাড়িয়া ও বাহাদুরপুর মৌজায় প্রায় ৪৫ বিঘা জমি রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
দমদত্ত বাড়িয়া গ্রামে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি আধুনিক ডুপ্লেক্স বাড়ির কথাও জানা গেছে।
প্রশ্ন হলো—এই জমি ও বাড়ির অর্থের উৎস কী?
অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়। স্ত্রী মাসুমা জলিলের নামে দমদত্ত বাড়িয়া ও পৈসাওতা মৌজায় প্রায় ১৫ বিঘা এবং শাশুড়ি মর্জিনার নামে একই এলাকায় প্রায় ১০ বিঘা জমি রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
একজন ব্যক্তির সম্পদ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে ছড়িয়ে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এসব সম্পদের প্রকৃত অর্থদাতা কে? ক্রয়ের সময় অর্থের উৎস কী ছিল?
তবে শুধু একই পরিবারের সদস্যের নামে সম্পদ থাকলেই তা অবৈধ প্রমাণিত হয় না; মালিকানা ও অর্থের উৎস নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
আব্দুল জলিলের তিন ভাই খলিলুর সরদার, অহিদুল সরদার ও জাহাঙ্গীরের নামে দমদত্ত বাড়িয়া মৌজায় আরও প্রায় ২৫ বিঘা জমি কেনার দাবি রয়েছে।
নিজের ৪৫, স্ত্রীর ১৫, শাশুড়ির ১০ এবং তিন ভাইয়ের ২৫ বিঘা—সব মিলিয়ে প্রায় ৯৫ বিঘা জমির হিসাব সামনে আসছে।
এখন মূল প্রশ্ন—এত বিপুল জমি কেনার অর্থ এল কোথা থেকে?
রাজধানীর উত্তরায় আব্দুল জলিলের একাধিক ফ্ল্যাট এবং ভবন নির্মাণাধীন থাকার কথাও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ঢাকার মতো ব্যয়বহুল এলাকায় এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তা জানতে হলে সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটের দলিল, রাজউকের নথি, কর-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং ক্রয়মূল্য যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সম্পদের উৎস যাচাই।
দুদক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে—
১. ভূমি অফিসের রেকর্ড,
২. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল,
৩. আয়কর রিটার্ন,
৪. ব্যাংক লেনদেন,
৫. চাকরিকালীন আয় ও সুযোগ-সুবিধার তথ্য,
৬. ঢাকার ফ্ল্যাট ও ভবনের মালিকানা নথি এবং
৭. পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ ক্রয়ের অর্থের উৎস
পর্যালোচনা করে প্রকৃত চিত্র বের করতে পারে।
আব্দুল জলিল সরদারের সম্পদ যদি বৈধ আয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই আয়ের উৎস ও নথি প্রকাশের মধ্য দিয়েই প্রশ্নগুলোর সহজ সমাধান হতে পারে।
আর যদি অভিযোগের কোনো অংশ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি।
কারণ প্রশ্নটা শুধু একজন ব্যক্তির সম্পদের নয়—প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ কর্মচারীর কয়েক দশকের আর্থিক উত্থানের সঙ্গে তাঁর দৃশ্যমান আয় ও সম্পদের হিসাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই প্রয়োজন নিরপেক্ষ, নথিভিত্তিক ও স্বচ্ছ অনুসন্ধান।
Leave a Reply