মো. শিফাত মাহমুদ ফাহিম, বিশেষ প্রতিনিধি:নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় এক সময়ের সাধারণ শ্রমিক আব্দুল জলিল সরদারের উত্থানের গল্প এখন স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে। তবে এটি কোনো অনুপ্রেরণার গল্প নয়; বরং ক্ষমতার প্রভাব, সরকারি দপ্তরের অপব্যবহার এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে ঘেরা এক বিতর্কিত উত্থান। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে শূন্য হাতে ঢাকায় যাওয়া এক ব্যক্তি কীভাবে শত বিঘা জমি, বিলাসবহুল বাড়ি এবং রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে উঠলেন—এ প্রশ্ন এখন এলাকায় তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শ্রমিক থেকে কাস্টমসের পিয়ন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালে আত্রাই থেকে ঢাকায় পাড়ি জমান আব্দুল জলিল সরদার। স্থানীয় ব্যক্তি মো. আজিমুদ্দিন সোনারের হাত ধরে রাজধানীতে যান তিনি। শুরুতে আজিমুদ্দিনের বাসায় বাজার করা, রান্না করা ও গৃহস্থালি দেখাশোনার মতো কাজ করতেন। পরে তারই সহায়তায় কাস্টমস বিভাগে মাস্টার রোলে পিয়ন হিসেবে চাকরি পান।
কিন্তু একজন পিয়নের সীমিত আয়ে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া কীভাবে সম্ভব—এ প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ফাইল চুরির অভিযোগ ও রহস্যজনক উত্থান
অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমসে কর্মরত থাকাকালীন একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি বা ফাইল চুরির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন জলিল। স্থানীয়দের দাবি, ওই ঘটনার পর থেকেই তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই তার আর্থিক অবস্থার অস্বাভাবিক উন্নতি ঘটে এবং তিনি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।
ফাইল চুরির ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে বিপাকে পড়ার আশঙ্কায় জলিল নানা কৌশলের আশ্রয় নেন। অভিযোগ আছে, তৎকালীন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়ার নাম ব্যবহার করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখানোর মাধ্যমেও বিষয়টি চাপা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া প্রভাব
পরবর্তীতে আত্রাইয়ের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন হেলালের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে এলাকায় নিজের প্রভাব বিস্তার করেন জলিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই রাজনৈতিক ছত্রছায়া তাকে আরও প্রভাবশালী করে তোলে এবং সেই সুযোগে তিনি অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন।
সম্পদের পাহাড়
বর্তমানে আব্দুল জলিল সরদার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে আত্রাই ও ঢাকায় বিপুল সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।
নিজ নামে সম্পদ:
হিঙ্গুলকান্দী, দমদত্ত বাড়িয়া ও বাহাদুরপুর মৌজায় তার নামে প্রায় ৪৫ বিঘা জমি রয়েছে। এছাড়া দমদত্ত বাড়িয়া গ্রামে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণাধীন রয়েছে।
রাজধানীতে সম্পদ:
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঢাকার উত্তরা এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে এবং আরও একটি ভবন নির্মাণাধীন।
পরিবারের নামে সম্পদ:
তার স্ত্রী মাসুমা জলিলের নামে দমদত্ত বাড়িয়া ও পৈসাওতা মৌজায় প্রায় ১৫ বিঘা জমি রয়েছে। একই এলাকায় তার শাশুড়ি মর্জিনার নামেও ১০ বিঘা জমি কেনা হয়েছে।
ভাইদের নামে সম্পদ:
তার তিন ভাই—খলিলুর সরদার, অহিদুল সরদার ও জাহাঙ্গীর সরদারের নামেও দমদত্ত বাড়িয়া মৌজায় আরও প্রায় ২৫ বিঘা জমি কেনা হয়েছে।
সব মিলিয়ে জলিল ও তার পরিবারের নামে প্রায় ১০০ বিঘারও বেশি জমি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
এলাকায় চাঞ্চল্য ও ক্ষোভ
একজন সাধারন লোক হয়ে কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন—এ প্রশ্নে আত্রাইজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই এটিকে দুর্নীতির জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে ব্যবসার আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনিয়মের মাধ্যমে এই বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। তাই এই সম্পদের প্রকৃত উৎস উদঘাটনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর জরুরি তদন্ত দাবি করেছেন তারা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, “একজন সাধারন ব্যবসা ও ঢাকা বন্ড কমিশনাারেট দক্ষিণ ও উত্তর এর বিভিন্ন অফিসারের ঘুসের টাকা বহনের কাজে নিয়োজিত আছে এসব ঘুসের টাকা দিয়ে শত বিঘা জমি ও কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তাই এর পেছনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা সমাজে দুর্নীতি ও অনিয়মকে আরও উৎসাহিত করবে।”
Leave a Reply