মো.শিফাত মাহমুদ ফাহিম,বিশেষ প্রতিনিধি:নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় আবারও উঠে এসেছে গ্রাম্য শালিশের নামে চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র। উপজেলার কোলা গ্রামের গৃহবধূ নার্গিস আক্তার ও তার পরিবার স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পূর্ব শত্রুতার শিকার হয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, একই গ্রামের জহুরুল (৩৯), পিতা মো. শাহাদাৎ হোসেন-এর সঙ্গে নার্গিসের বিরুদ্ধে একটি ভিত্তিহীন ও আপত্তিকর অভিযোগ ছড়ানো হয়। অভিযোগে বলা হয়, তারা ভুট্টা ক্ষেতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা সাক্ষ্য না থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বিষয়টিকে কেন্দ্র করে একটি কথিত “গ্রাম্য শালিশ” বসায়।
অভিযোগ রয়েছে, ওই শালিশের নেতৃত্ব দেন ইউপি চেয়ারম্যান (প্যানেল) ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. কালাম হোসেন। তার সঙ্গে গ্রাম্য প্রধান মো. আলতাব হোসেন, মো. খলিল, মো. জিয়াউর রহমান ও মিজান হোসেনসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন।
শালিশের নামে সেখানে যা ঘটেছে, তা কোনো বিচার নয়—বরং ছিল এক প্রহসন ও ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন। দুই পক্ষের কাছ থেকেই জোরপূর্বক মোট ১ লক্ষ ১২ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এটি মূলত পূর্ব শত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে করা একটি চাঁদাবাজির ঘটনা।
গৃহবধূ নার্গিস আক্তার (৩৫), স্বামী সিদ্দিক হোসেন, ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“আমাদের কাউকে কেউ ধরেনি, কেউ দেখেও নাই। তারপরও মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমাদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। আমার ছেলেকে জিম্মি করে রেখে জোর করে টাকা আদায় করেছে। আমরা এর সঠিক বিচার চাই।”
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল বলছে, এ ধরনের ঘটনা শুধু আইনবহির্ভূতই নয়, বরং সমাজে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে দিচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে মো. কালাম হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে পরবর্তীতে ঘটনাটি স্বীকার করে নেন এবং টাকা নেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেন, যা পুরো ঘটনাকে আরও সন্দেহজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
এ প্রসঙ্গে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. আলাউল ইসলাম বলেন,“বর্তমানে গ্রাম্য শালিশের কোনো বৈধতা নেই। গ্রাম্য আদালতের মাধ্যমে বিচার করা যেতে পারে। কিন্তু শালিশের নামে কাউকে হেনস্তা করা হলে তা গুরুতর অপরাধ। ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রাম্য শালিশের নামে এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চললেও অনেক সময় প্রভাবশালীদের কারণে তা প্রকাশ পায় না। কিন্তু সাম্প্রতিক এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে—আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিলেই ব্যস্ত।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কতটা দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়। নাকি প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে আবারও ধামাচাপা পড়ে যাবে একটি নিরপরাধ পরিবারের আর্তনাদ?
Leave a Reply