নিজস্ব প্রতিবেদক:নওগাঁ জেলার আত্রাই থানার অন্তর্গত আত্রাই নদীর তীরবর্তী একটি বেদে পল্লীতে কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে মর্মান্তিক এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। রবিবার রাতের প্রবল ঝড়-বৃষ্টির সময় একটি ইউক্যালিপটাস গাছ ভেঙে পলিথিনে তৈরি অস্থায়ী ঘরের ওপর পড়ে যায়। এতে গুরুতর আহত হন আরাফাতুন (২০) নামে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারী। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরদিন সকালে নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মো.তারিকুল ইসালম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বেদে পল্লীর ভয়াবহ ও মানবেতর জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, সেখানে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি পলিথিনে তৈরি টুকরি ঘরে সমসংখ্যক পরিবার বসবাস করছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করলেও তাদের নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জীবিকার তাগিদে তারা বিভিন্ন সময় স্থান পরিবর্তন করে ঘুরে বেড়ায়।
পল্লী পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, সেখানে বসবাসরত অনেক শিশু রয়েছে যারা সম্পূর্ণভাবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। কোনো স্কুলে যাওয়া তো দূরের কথা, প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দারিদ্র্য ও অনিশ্চিত জীবনের কারণে শিশুদের শিক্ষার বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরিদর্শনকালে পুলিশ সুপার শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান, তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি জানান, অন্তত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একজন শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে, যাতে শিশুরা মৌলিক শিক্ষা লাভ করতে পারে। এ সময় তিনি শিশুদের জন্য সামান্য নাস্তার অর্থও সহায়তা হিসেবে প্রদান করেন।
তিনি বেদে পল্লীর বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ভাগ্যের পরিবর্তন কখনোই নিজে থেকে আসে না। এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রচেষ্টা। আর সেই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। আপনারা যেখানেই থাকুন না কেন, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও বিষয়টি শেয়ার করা হয়েছে বলে তিনি জানা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলে ভর্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়, বরং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সচেতন মহলের দাবি, এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসের অবসান ঘটানো এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি, বেদে পল্লীর শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ, একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর জীবনমান উন্নত হয়।
Leave a Reply