মো.শিফাত মাহমুদ ফাহিম,বিশেষ প্রতিনিধি: নওগাঁ জেলার আত্রাই-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়ক কি ধীরে ধীরে ছিনতাইকারী, ডাকাত ও দুর্বৃত্তদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হচ্ছে? একের পর এক ছিনতাই, ডাকাতি, হামলা ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় এমন প্রশ্নই এখন স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে। সর্বশেষ বুধবার (১৭ জুন ২০২৬) সকালে আত্রাই উপজেলার সাহাগোলা ইউনিয়নের শিমুলিয়া এলাকায় রেললাইনের পূর্ব পাশে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত ব্যক্তি নিয়ামুল বসির (৫০)। তিনি নওগাঁ সদর উপজেলার রজাকপুর গ্রামের মৃত নজিবর রহমানের ছেলে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ঝিঁকরা গ্রামে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি মক্কা হজ কাফেলার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালেও তিনি নিজ বাসা থেকে আত্রাইয়ে আসেন। দিনভর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় ভ্যানচালক মো. হলু (৪৫)-এর ভ্যানে চলাফেরা করেন। রাত আনুমানিক ৮টার দিকে আত্রাই রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে চা পান করেন এবং পরে পাশের একটি ফলের দোকানে কিছু সময় অবস্থান করেন। এরপর তিনি কীভাবে, কখন এবং কোন যানবাহনে নওগাঁর উদ্দেশ্যে রওনা হন, তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। কেউ বলছেন তিনি ট্রেনে উঠেছিলেন, আবার কেউ ধারণা করছেন সিএনজিযোগে রওনা দিয়েছিলেন।
পরদিন সকালে শিমুলিয়া এলাকায় রেললাইনের পূর্ব পাশে তার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে আত্রাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহের সুরতহাল কার্যক্রম শুরু করে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহতের ডান হাতে কাটা-ছেঁড়া এবং মাথার পেছনে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে এ কারণে যে, তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন, হাতঘড়ি ও নগদ টাকা অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ফলে এটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ওপর নির্ভর করতে হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
একের পর এক অপরাধে আতঙ্কিত মানুষ
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে আত্রাই-নওগাঁ মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। দিনের পর দিন ছিনতাই, ডাকাতি ও হামলার ঘটনা ঘটলেও অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৫ মার্চ ভোরে মহাদিঘী উত্তরপাড়া ভাঙা ব্রিজ এলাকায় কাপড় ব্যবসায়ী মো. শওকত হোসেন (৫০)-কে মারধর করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর ১৬ মে দিবাগত রাতে থাঐপাড়ার দক্ষিণ ভাঙাব্রিজ এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল প্রায় ৩০টি যানবাহন থামিয়ে যাত্রীদের নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নেয়। ওই ঘটনার পরও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি।
সবশেষ ২৫ মে আমরুলকসবা এলাকায় মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে আল-আমিন হোসেন-এর কাছ থেকে নগদ ১৬ হাজার ২০০ টাকা ও কাপড় ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একই সড়কে ধারাবাহিক অপরাধের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। সন্ধ্যার পর অনেক যাত্রী ও ব্যবসায়ী প্রয়োজন ছাড়া এই সড়ক ব্যবহার করতে সাহস পান না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
যদিও নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম-এর নির্দেশনায় টহল ও বিশেষ অভিযান জোরদারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তবুও স্থানীয়দের অভিযোগ—বাস্তবে অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অভিযান পরিচালনা করা হলেও, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তাদের ভাষ্য, একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়কে বারবার একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়া উদ্বেগজনক। এতে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এবং অপরাধীরা যেন বারবার একই এলাকায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
পুলিশের বক্তব্য
আত্রাই থানা পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আলামত সংগ্রহ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
Leave a Reply