মো.শিফাত মাহমুদ ফাহিম নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ
জেলার আত্রাই দীর্ঘ ১৯ মাস ধরে নিখোঁজ থাকা সুমন (৩৯) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতায় দীর্ঘদিনের এই ‘ক্লু-লেস’ মামলার জট খুলেছে। প্রধান আসামি শফিউলকে গ্রেফতারের পর তার দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী একটি পুকুরের ডোবা সেচে উদ্ধার করা হয়েছে সুমনের কঙ্কাল ও দেহাবশেষ। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নিখোঁজ থেকে কঙ্কাল উদ্ধার: ঘটনার আদ্যোপান্ত
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের জুন মাসে। সে সময় ৩৯ বছর বয়সী সুমন বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও দীর্ঘদিন তার কোনো খোঁজ মেলেনি। বাড়ির পাশে রক্তের দাগ দেখে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলেও লাশের হদিস না পাওয়ায় তদন্তে স্থবিরতা নেমে আসে। দীর্ঘ ১৯ মাস অন্ধকারেই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য।
সম্প্রতি নিহতের পরিবার নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করে বিচার দাবি করেন। পুলিশ সুপারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আত্রাই থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ টিম তদন্তে নামে।প্রযুক্তির ব্যবহারে আসামিকে শনাক্ত তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী না থাকায় মামলাটি অত্যন্ত জটিল ছিল। তবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ও উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রধান সন্দেহভাজন শফিউলকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শফিউল স্বীকার করে যে, সে এবং তার ভাই সায়েম মিলে সুমনকে হত্যা করেছে।
হত্যার নেপথ্যে ‘প্রতিশোধ’পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শফিউল জানায়, তার স্ত্রীর শ্লীলতাহানি করার অভিযোগে সুমনের ওপর তার ক্ষোভ ছিল। সেই প্রতিশোধ নিতেই তারা দুই ভাই পরিকল্পনা করে সুমনকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করে। হত্যার পর প্রমাণ লোপাট করতে লাশটি গুম করার উদ্দেশ্যে পাশের একটি পুকুরের গভীর কাদার নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়।
তদন্তে আরও উঠে আসে যে, সুমনের সহযোগী ও ছোট ভাই সায়েম কিছুদিন আগে আত্মহত্যা করায় এই মামলায় এখন শফিউলই প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে থাকছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কঙ্কাল উদ্ধার
শুক্রবার বিকেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে শফিউলের দেখানো স্থানে পুকুরের পানি সেচে তল্লাশি চালানো হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর কাদার নিচ থেকে সুমনের কঙ্কাল ও হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত দেহাবশেষগুলো ডিএনএ প্রোফাইলিং ও ময়নাতদন্তের জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “এটি একটি সম্পূর্ণ ক্লু-লেস মামলা ছিল। আমরা আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে খুনিকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অপরাধী যেই হোক তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
এলাকাবাসীর ও তার পরিবারের দাবি দীর্ঘ ১৯ মাস পর হলেও ভাইয়ের দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন সুমনের স্বজনরা। তারা খুনি শফিউলের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবি করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও পুলিশের এই সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. করিম উদ্দিন জানান,আমাদের সম্মানিত পুলিশ সুপার মহোদয়ের দিকনির্দেশনায় সুমনের হত্যাকারী শফিউল প্রথমে গ্রেফতার করি এরপর জিজ্ঞাবাদের পর তার দেখানো স্থান থেকে হতভাগা সুমনের লাশের কঙ্কাল উদ্ধার করি।এখন আদালতের মাধ্যমে আসামী শফিউলকে কারাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
Leave a Reply