মো.শিফাত মাহমুদ ফাহিম, বিশেষ প্রতিনিধি:নওগাঁ জেলায় আন্তঃকলেজ ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে সংঘটিত নির্মম হামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। ফুটবলের মাঠে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যে নৃশংসতা দেখানো হয়েছে—তা আজ শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। আর সেই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে পড়ে আছে এক তরুণ ফুটবলারের জীবন—মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজের অধিনায়ক তানভীর।
গত ১৮ নভেম্বর নওগাঁ জেলা আন্তঃকলেজ ফুটবল খেলায় বিজয়ী হওয়া মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজের ফুটবল দলকে রাস্তায় ঘিরে ধরে হামলা চালায় রাণীনগর উপজেলার সায়েম উদ্দিন কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীরা সহ ভাড়াটিয়া সন্ত্রীরা।মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তানভীর সহ ১৫জন। মাথা, বুকে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত নিয়ে তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখনও আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ে যাচ্ছে তরুণটি।
তানভীরের বাবার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। হাসপাতালের করিডোরে বসে বারবার শুধু একটি কথাই বলছেন—
“আমার ছেলেটা কী দোষ করছিল? খেলা তো খেলার মতোই হওয়া উচিত… ওকে তো ওরা খেলার মাঠে নয়, মেরে ফেলতে চেয়েছিল!”
এ ঘটনার পর ২১ নভেম্বর তানভীরের পিতা শাহাজাহান আলী বগুড়ার আদমদীঘী থানায় ২০ জনকে আসামি করে এজাহার দায়ের করেন। কিন্তু পাঁচদিন পার হলেও আসামিদের গ্রেফতারের কোনো অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছে কলেজের শিক্ষার্থীরা।
আজ মঙ্গলবার কলেজ চত্বরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। আবেগঘন স্লোগান আর তীব্র প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
মানববন্ধনে এক শিক্ষার্থী কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন—
“তানভীর ভাই আমাদের অনুপ্রেরণা। ওর মতো পরিশ্রমী অধিনায়ক খুব কম পাওয়া যায়। আজ ও বাঁচার জন্য লড়ছে, আর হামলাকারীরা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে—এটা আমরা মেনে নেব না।”
একজন শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—
“শিক্ষাঙ্গনে এমন সহিংসতা বরদাশত করা যায় না। হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থী নিরাপদ থাকবে না।”
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অভিভাবকদের কণ্ঠেও ছিল আতঙ্ক ও ক্ষোভের মিশ্র সুর। তারা বলেন, সন্তানকে কলেজে পাঠিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় থাকতে চান না। খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে সন্তানদের প্রাণহানির ভয় নিয়ে বাঁচতে রাজি নন কেউই।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে আদমদীঘী থানার অফিসার ইনচার্জকে ফোন করা হলে তিনি বলেন—বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি অতিদ্রুতই দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের দাবি একটাই—হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার, এবং তানভীরের জন্য সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। তাদের ভাষায়—
“একজন তানভীরের জীবন কোনোভাবেই এভাবে থেমে যেতে পারে না। আমরা বিচার চাই, ন্যায় চাই—এখনই চাই।”
আত্রাইয়ের এই শান্ত জনপদে ঘটে যাওয়া এ ঘটনা শিক্ষাঙ্গন থেকে মাঠ পর্যন্ত আলোড়ন তুলেছে। তানভীরের জীবনযুদ্ধ, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আর একটি পরিবারের সীমাহীন শোক আজ সমাজের সামনে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—
খেলা কি আর খেলার জায়গায় আছে? নাকি আগ্রাসন আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে গ্রাস করে ফেলছে?
Leave a Reply