মো.শিফাত মাহমুদ ফাহিম,বিশেষ প্রতিনিধি:মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় তিনটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে দুটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে আত্রাই নদী থেকে এবং একটি উদ্ধার করা হয়েছে আত্রাই-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়ক সংলগ্ন রেললাইনের পাশ থেকে। এসব ঘটনার প্রকৃত রহস্য এখনও উদ্ঘাটিত না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ শনিবার (২৭ জুন) সকালে উপজেলার ৮ নম্বর হাটকালুপাড়া ইউনিয়নের বান্দাইখাড়া বাজার সংলগ্ন আত্রাই নদী থেকে মো. আলিমুদ্দিন (৮৫) নামে এক বৃদ্ধের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে আত্রাই থানা পুলিশ। তিনি মান্দা উপজেলার শিবনগর ঘোষপাড়া গ্রামের মৃত দুখু মিয়ার ছেলে।
স্থানীয়রা জানান, সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরিবারের দাবি, শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এর আগে গত ২৩ জুন রাতে উপজেলার বিশা ইউনিয়নের দর্শনগ্রামের এনজিও কর্মী শেখর কুমার সরকার (২৫)-এর মরদেহ উদ্ধার করা হয় আত্রাই নদীর তীর থেকে। তিনি বগুড়ার একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। পরিবারের ভাষ্যমতে, কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরে কিছুক্ষণ পর বাইরে বের হন তিনি। গভীর রাত পর্যন্ত বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলে নদীর তীরে তার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। ঘটনাস্থলে বমির আলামত পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
এরও কয়েকদিন আগে, ১৭ জুন সকালে উপজেলার সাহাগোলা ইউনিয়নের শিমুলিয়া এলাকায় রেললাইনের পূর্ব পাশে উদ্ধার করা হয় নিয়ামুল বসির (৫০) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি হজ কাফেলার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার মাথার পেছনে ও হাতে আঘাতের চিহ্ন থাকলেও সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন, হাতঘড়ি ও নগদ টাকা অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে ঘটনাটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এদিকে শুধু রহস্যজনক মৃত্যুই নয়, গত কয়েক মাস ধরে আত্রাই-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কে ছিনতাই, ডাকাতি ও হামলার একাধিক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। গত ২৫ মার্চ মহাদিঘী এলাকায় এক কাপড় ব্যবসায়ী ছিনতাইয়ের শিকার হন। ১৬ মে রাতে দক্ষিণ ভাঙাব্রিজ এলাকায় সংঘবদ্ধ ডাকাত দল প্রায় ৩০টি যানবাহন থামিয়ে যাত্রীদের সর্বস্ব লুট করে নেয়। এছাড়া ২৫ মে আমরুলকসবা এলাকায় এক মোটরসাইকেল আরোহীর কাছ থেকেও নগদ টাকা ও মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরাধের ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর এই সড়কে চলাচল করতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় কাজ করছে।
আত্রাই থানা পুলিশের দাবি, প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আলামত সংগ্রহ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
একের পর এক রহস্যজনক মৃত্যু, নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার এবং মহাসড়কে সংঘটিত ধারাবাহিক অপরাধের ঘটনায় আত্রাইবাসীর একটাই প্রশ্ন—জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ কবে নেওয়া হবে? মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পুরো উপজেলাজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
Leave a Reply