সত্যটা স্বীকার করতে সাহস লাগে। আর সেই সত্যটা হলো—আমাদের বাজার এখন আর মুক্ত নয়, এটি দখলে আছে সিন্ডিকেটের। এখানে পণ্যের দাম ঠিক হয় না উৎপাদন খরচ বা ন্যায্য মুনাফার ভিত্তিতে; ঠিক হয় দখলদারদের ইশারায়।
হাফেজ এনামুল হাসান নবীনের ঘটনাটি তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি অসুস্থ ব্যবস্থার নগ্ন প্রকাশ। একজন উদ্যোক্তা, যিনি কম দামে ভালো পণ্য দিতে চেয়েছিলেন, তাকেই বাজার থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে। তার “অপরাধ”—তিনি সিন্ডিকেটের নিয়ম মানেননি।
কী ভয়ংকর সেই নিয়ম? ৪৫০০ টাকার নিচে পাঞ্জাবি বিক্রি করা যাবে না! অর্থাৎ ক্রেতা ঠকবে, কিন্তু সিন্ডিকেটের লাভ ঠিকই থাকবে। আর কেউ যদি সেই চক্র ভাঙতে চায়, তার জন্য অপেক্ষা করছে হুমকি, হামলা, ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া—এটাই এখনকার বাস্তবতা।
সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা যাদের, সেই রাষ্ট্রযন্ত্রই যদি নীরব দর্শক না থেকে সক্রিয় সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়—তাহলে সাধারণ মানুষের ভরসা কোথায় থাকবে? অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুরক্ষা না দিয়ে উল্টো দোকান বন্ধে সহায়তা করেছে। যদি সেটি সত্য হয়, তবে এটি শুধু দায়িত্বহীনতা নয়—এটি সরাসরি অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
এই ঘটনাকে আরও নির্মম করে তুলেছে আরেকটি দিক—নবীনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষরা। অর্থাৎ এটি ছিল মানবিক উদ্যোগেরও একটি উদাহরণ। কিন্তু এই সমাজ সেই মানবিকতাকে পুরস্কৃত করেনি, বরং শাস্তি দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কী হলো? একজন উদ্যোক্তা দেশ ছাড়লেন। তার স্বপ্ন ভেঙে গেল। আর সিন্ডিকেট রয়ে গেল অক্ষত, অপ্রতিরোধ্য।
এখন প্রশ্নটা সরাসরি—এই দেশে কি সৎভাবে ব্যবসা করা সম্ভব? যদি কম দামে ভালো পণ্য দেওয়া অপরাধ হয়, তাহলে আমরা কিসের অর্থনীতি গড়ছি? মুক্ত বাজারের, নাকি দখলদারিত্বের?
এই নীরবতা সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ অন্যায় যখন প্রকাশ্যে ঘটে, আর সমাজ তখন চুপ থাকে—তখন সেই অন্যায়ই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।
হাফেজ এনামুলের চলে যাওয়া শুধু একজন মানুষের পরাজয় নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা। আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে ভালো মানুষ টিকতে পারে না, আর লুটেরারা দিব্যি রাজত্ব করে।
এই বাস্তবতা যদি না বদলায়, তাহলে ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার। কারণ তখন আর কেউ সাহস করবে না সৎ পথে হাঁটতে—আর আমরা সবাই ধীরে ধীরে বন্দী হয়ে যাবো এক নিষ্ঠুর, নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার মধ্যে।
মো.শিফাত মাহমুদ ফাহিম
গণমাধ্যমকর্মী।
Leave a Reply